অ্যান্টন চেখভ

বহুরূপী

অ্যান্টন চেখভের ছোটগল্প ‘বহুরূপী’ সম্পূর্ণ বাংলায় পড়ুন। পুলিশ ইন্সপেক্টর ওচুমেলভ, একটি কুকুর আর বাজারের মানুষের বদলে বদলে মতামতের রূপক।

গল্পের সারসংক্ষেপ

বাজারের ভিতরে হাঁটতে গিয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর ওচুমেলভ দেখেন সোনার্কর শ্যামরা খিউকিনকে একটি কুকুর কামড়েছে। প্রথমে তিনি কুকুরটিকে শাস্তি দিতে চান, কিন্তু ভিড়ের মতামত বদলাতেই বদলাতে থাকেন—কখনো কুকুরের পক্ষে, কখনো লোভী লোভীর পক্ষে। শেষে তিনি যাকে সবচেয়ে অপরাধী ভেবেছিলেন, খিউকিনকেই হুমকি দিয়ে চলে যান। এই গল্পের রূপক স্পষ্ট: মানুষ মূলত যাকে চেনে না, তাকেই নিজের মতো করে নেয়।

বহুরূপী

পুলিশ ইন্সপেক্টর ওচুমেলভ হেঁটে যাচ্ছিলেন বাজারের মধ্যে দিয়ে। গায়ে তাঁর নতুন ওভারকোট, হাতে ছড়ি এবং পিছনে এক কনস্টেবল। চুলের রঙ লাল, হাতের তালু ভর্তি হয়ে গেছে বাজেয়াপ্ত করা গরুর দাঁতের আঙুলের ছাপে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই... বাজার একেবারে খাঁ খাঁ করছে... ক্ষয়ে ক্ষয়ে দোকান আর সরাইখানার খোলা দরজাগুলো যেন এক সারি ক্ষুধার্ত মুখগহ্বরের মতো দীনদশার দিকে হাঁ করে আছে। ধারে কাছে একটি মুদির দোকান পর্যন্ত দাঁড়িয়ে নেই।

হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘কামড়াতে এসেছ হতচ্ছাড়া, বটে? ওকে ছাড়ো না হে। কামড়ে বেড়াবে, সে আইন নেই আর। পাকড়ো পাকড়ো! হেই!’

কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাকও শোনা গেল একটা। ওচুমেলভ শব্দের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, ‘পচা গন্ধ দোকানীর কাঠগোলা থেকে বেরিয়ে এসে একটা কুকুর তিন পায়ে লাফাতে লাফাতে ছুটছে আর তার পেছন পেছন তাড়া করেছে একটি লোক, গায়ে তার মলিন ছাপা কাপড়ের জামা, ওয়েস্টকোটের বোতাম সব খোলা, সারা শরীর ঝুলে পড়েছে সামনের দিকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা কুকুরের পিছনের পা চেপে ধরল। কুকুরটা আবার কেঁউ কেঁউ করে উঠল, আবার চিৎকার শোনা গেল, ‘পাকড়ো, পাকড়ো!’ দোকানগুলো থেকে উসকানি দিতে লাগল নানা তন্দ্রাচ্ছন্ন মুখ। দেখতে দেখতে যেন মাটি ফুঁড়ে ভিড় জমে উঠল কাঠগোলার কাছে।

কনস্টেবল বললে, ‘বেআইনী হৈ হৈ বলে মনে হচ্ছে, হুজুর।’

ওচুমেলভ ঘুরে দাঁড়িয়ে দমদম করে গেলেন ভিড়টার কাছে। কাঠগোলার ফটকের ঠিক সামনেই তাঁর নজরে পড়ল বোতাম খোলা ওয়েস্টকোট-পরা সেই মানুষটি দাঁড়িয়ে। ডান হাত উঁচু করে লোকটা তার রক্তমাখা আঙুলখানা সবাইকে দেখাচ্ছে। তার মাতাল চোখমুখগুলো যেন বলছে, ‘শালাকে দেখে নেবো! আঙুলটা যেন তার বিজয়েরই নিশান!’ লোকটাকে ওচুমেলভ চিনেন—শ্যামরা খিউকিন। ভিড়ের ঠিক মাঝখানটায় বসে আছে আসামান, অর্থাৎ বাজেহি জাতের একটি বাচ্চা কুকুর—চোখা নাক, পিঠের ওপর হলদে একটা ছোপ। সারা গা তার কাঁপছে। সামনের দুপা ফাঁক করে সে বসে, সজল দুই চোখে রাগ আর আতঙ্কের ছাপ।

ভিড় ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে ওচুমেলভ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাপারটা কী? কী লাগিয়েছ তোমরা? আঙুল তুলে রেখেছিস কী জন্যে? চিল্লাচ্ছিল কে? কে চিল্লাচ্ছিল?’

খিউকিন মুঠো করা হাতের ওপর একটু কেশে নিয়ে শুরু করলে, ‘আমি, হুজুর, হেঁটে যাচ্ছিলাম নিজের মনে, কারও কোনো ক্ষতি না করে। ওই তো ওই দাঁড়িয়ে মা মিত্কা—ওর দরকার ছিল একটা কাঠের টুকরো। তা হঠাৎ, হুজুর, এই কুত্তার বাচ্চাটা এসে কামড়ে দিলে একেবারে। বুঝুন হুজুর, মেহনত করে খেতে হয় আমাদের... আমার ব্যবসার কাজটাও তেমন সাদামাটা নয় হুজুর—এর জন্যে ক্ষতিপূরণ চাইতে হবে উঁকে। যা ক্ষতি তাতে আঙুলটা তো আর হপ্তাখানেক নাড়াচাড়া চলবে না। হবে আমাদের? সব কিছুই যদি কামড়াতে লেগে যায় তবে জীবনে সুখ কী রইল, আজ্ঞে?’

‘হুম্, বটে!’ গলা খাকার দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে ওচুমেলভ বললেন কড়া সুরে, ‘ঠিক আছে... কার কুকুর এটা? এ আমি সহজে ছাড়ছি না! কুকুর ছেড়ে রাখার মজা দেখিয়ে ছাড়ব! যেসব ভদ্রলোক আইন মেনে চলতে চান না তাঁদের ওপর নজর দেবার সময় এসেছে। শালার ওপর এমন জারিমানা চাপাবো যে শিক্ষা হয়ে যাবে: যত রাজ্যের গরু ভেড়া কুকুরকে চরতে ছেড়ে দেওয়ার মানে কী! কত ধানে কত চাল তা টের পাওয়াচ্ছি।’

কনস্টেবলের দিকে ফিরে ওচুমেলভ হাঁকলেন, ‘এলদোরিন, তল্লাশ লাগাও কার কুত্তা, আর একটা এজাহারও লিখে ফেলো। যা মনে হচ্ছে এ কুকুর ক্ষ্যাপা না হয়ে যায় না—ওটাকে সাবাড় করে ফেলা দরকার এখানেই!... কার কুকুর এটা, জবাব দাও, কার কুকুর?’

ভিড় থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘মনে হচ্ছে ওটা জেনারেল ঝিগালভের কুকুর।’

‘জেনারেল ঝিগালভ? হুম্!... এলদোরিন, আমার কোটটা খুলে দাও... উহ্ কী গরম! বোধ হয় বৃষ্টি পড়বে।’ ইন্সপেক্টর খিউকিনের দিকে তাকালেন, ‘কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না, তোকে কামড়ালো কী করে? একেবারে হাতের আঙুলে গিয়ে কামড় বসালো, এটা কী রকম? এইটুকু একটা বাচ্চা কুকুর আর তুই বেটা এমন এক মদ্দা জোয়ান, আর তুই আঙুলটা পেরেক দিয়ে খুঁচিয়ে এখন মতলব করছিস ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায় কিনা। তোদের চিনতে তো আমার বাকি নেই, শয়তানের ঝাড় সবাই!’

‘ও লোকটা, হুজুর, তামাশা করে কুকুরটার নাকে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিতে গিয়েছিল। কুকুরটাও তখন কামড় লাগিয়েছে। এ খিউকিন হুজুর, চিরকালই বদমাইসি করে বেড়ায়।’

‘মিছে কথা বলছিস, ব্যাটা! আমাকে ছ্যাঁকা দিতে দেখেছিস? তবে মিছে কথা বলছিস কেন? হুজুরের বুদ্ধি বিবেচনা আছে। উনি নিজেই বুঝতে পারবেন কে মিছে বলছে, কে সত্যি বলছে। মিছে কথা বললে আদালতে তার বিচার হবে। আইন হয়ে গেছে... সব মানুষ এখন সমান বটে। না জানিস তো বলি, আমারও এক ভাই প্যালেসে... তর্ক কোরো না, তর্ক কোরো না বলছি।’

‘ঠিক বলেছ, এটা জেনারেলের কুকুর নয়।’ কনস্টেবল বললে বিচক্ষণভাবে, ‘অমন কোনো কুকুরই নেই জেনারেলের। ওনার সব ক’টা কুকুরই শিকারী কুকুর।’

‘ঠিক জানিস?’

‘ঠিক জানি, হুজুর।’

‘ঠিকই বটে, আমিও তাই ভাবছিলাম! জেনারেলের কুকুরগুলো নেহাৎ দামি দামি, উচ্চজাতের কুকুর। আর এটা—তাকাতেই ইচ্ছে করে না, হতকুচ্ছিত খেঁকশিয়াল টাইপের একটা। অমন কুকুর কেউ পোষে নাকি? তোদের মাথা খারাপ? মস্কো কি পিটার্সবার্গে ওরকম কুকুর দেখা গেলে কী হত জানিস? আইন দেখত না ছাই, পেলেই দফা শেষ করে ছাড়ত। খিউকিন, তোমাকে কামড়েছে মনে রেখো, সহজে ব্যাপারটা ছাড়া হবে না। শিক্ষা দেওয়া দরকার! সময় হয়েছে...।’

কনস্টেবল আপন মনে বলতে শুরু করলে, ‘তা জেনারেলের কুকুরও হয়ে যেতে পারে শেষ পর্যন্ত! চেহারা দেখে কি কিছু বলা যায়। সেদিন জেনারেলের উঠোনে এমন একটা কুকুর দেখেছিলাম যেন।’

‘জেনারেলের কুকুরই তো বটে!’ ভিড় থেকে কে একজন বললে।

‘হুম... এলদোরিন কোটটা পরিয়ে দে... দমকা হাওয়া দিল কেমন, শীত করছে... জেনারেলের কাছে এটাকে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়। বলবি, আমি কুকুরটাকে পেয়ে পাঠিয়েছি। বলবি, অমন করে যেন রাস্তায় ছেড়ে না দেন। হয়ত বা দামি কুকুর। শেয়ালগুলো যদি সবাই সিগারেট দিয়ে অমন করে নাকে ছ্যাঁকা দিতে থাকে তবে অমন দামি কুকুরের বারোটা বেজে যেতে কতক্ষণ? কুকুর হল গিয়ে আদুরে জীব... আর তুই ব্যাটা আহাম্মক, হাত নামা শিগগির! উজবুকের মতো আঙুল দেখাচ্ছিস কাকে? তোরই তো দোষ।’

‘ওই তো জেনারেলের বাবুর্চি এসে গেছে। ওকেই জিজ্ঞেস করা যাক... ওহে, ও ভাই প্রোখর, এসো তো বাপ একটু! দেখো তো ভালো করে, কুকুরটা কি তোমাদের?’

‘মানে! কস্মিনকালেও অমন কোনো কুকুর আমাদের ছিল না।’

‘বাস, বাস! ব্যাপারটা বোঝা গেল তাহলে।’ ওচুমেলভ বললেন, ‘বেওয়ারিশ একটা কুকুর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গালগল্প করে আর কী হবে। বলছি বেওয়ারিশ কুকুর, বাস, ওটাকে খতম করে ঝামেলা চুকিয়ে দেওয়া যাক।’

প্রোখর কিন্তু বলে চলল, ‘এটা আমাদের নয়। এই সেদিন হল জেনারেলের ভাই এসেছেন, এটা তাঁরই কুকুর। বজেহি জাতের কুকুর সম্পর্কে আমাদের জেনারেলের কোনোই শখ নেই। কিন্তু তাঁর ভাই—ওঁর পছন্দ হল গিয়ে...।’

‘কী বললে, জেনারেলের ভাই? ভ্লাদিমির ইভানিচ এসেছেন?’ ওচুমেলভ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, তাঁর সারা মুখ ভরে উঠল এক অপার্থিব হাসিতে, ‘কী কান্ড। আর আমি না জানি না! এখন থাকবেন বুঝি?’

‘হ্যাঁ, থাকবেন।’

‘কী কান্ড। ভাইকে দেখতে এসেছেন। আর আমি খবর পাইনি! কুকুরটা তাহলে ওঁরই? ভারি আনন্দের কথা। নাও হে নাও ওটিকে... তোফা ছোট্ট কুকুরটি। ওর আঙুলে কামড়ে দিয়েছে! হাঃ হাঃ হাঃ! তু তু, আরে কাঁপছিস কেন? ... বাচ্চাটা রেগে গেছে... কী তোফা বাচ্চা!’

প্রোখর কুকুরটাকে ডেকে নিয়ে কাঠগোলা থেকে চলে গেল। ভিড়ের লোকগুলো হেসে উঠল খিউকিনের দিকে চেয়ে। ওচুমেলভ হুমকি দিলেন, ‘দাঁড়া না, তোকে আমি দেখাচ্ছি পরে।’ তারপর ওভারকোটটা ভালো করে গায়ে টেনে নিয়ে বাজারের মধ্য দিয়ে হেঁটে চললেন।

Contact form