Tuesday, September 22, 2026

১৯৭১: বামপন্থীদের ভূমিকা — কে বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, কে বিরোধী

১৯৭১: বামপন্থীদের ভূমিকা — কে বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, কে বিরোধী

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট ও বামপন্থী শক্তিগুলোর অবস্থান নিয়ে একটি তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধ। প্রতিটি দাবির নিচে উৎস ও ওয়েব লিংক দেওয়া আছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনের মধ্যে যে ভাঙন দেখা দেয়, তা নিয়ে আজও নানা মত প্রচলিত। একদল মানেন, বামপন্থীরা সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল; অন্যদল বলেন, বামপন্থীরা প্রথম থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পাশে ছিল। উভয় পক্ষই একদিকে আংশিক সত্য বলছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিচ্ছে। নিচে যাচাই-বাচাই করা নাম, ঘটনা, তারিখ ও সূত্রসহ সেই সম্পূর্ণ ছবিটি তুলে ধরা হলো।

প্রথমেই একটি সতর্কতা: তিনটি শিবির

সব কমিউনিস্ট বা বামপন্থী একভাবে আচরণ করেননি — তাই “বামপন্থীরা বাংলাদেশবিরোধী ছিল” বললে ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় হবে। তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখলে তিনটি শিবির পাওয়া যায়:

শিবির কোন কোন শক্তি ১৯৭১ সালে অবস্থান
ক. বাংলাদেশের চাহিদা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা কলকাতার সিপিআই(এমএল) — চারু মজুমদার ও আসিম চট্টোপাধ্যায় গোষ্ঠী; পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) — তোহা–আব্দুল হক; কয়েকটি ছোট মাওবাদী গোষ্ঠী বিদ্রোহকে বলা হয় “চীনবিরোধী ষড়যন্ত্র”, মুজিবকে বলা হয় “আমেরিকার এজেন্ট”; এক দল বলে ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধ “ন্যায়সংগত”; আব্দুল হকের গোষ্ঠী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে সাহায্যের প্রস্তাব দেয়
খ. জনগণের পক্ষে, কিন্তু ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা পশ্চিমবঙ্গের সিপিআই(এম) পূর্ব বঙ্গের সংগ্রামকে প্রকাশ্য সমর্থন, মুজিবনগর সরকারের স্বীকৃতির দাবি, শরণার্থী ত্রাণে নামেন — কিন্তু ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে বিবৃতি দেয়
গ. মুক্তিযুদ্ধে লড়াছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মনি সিং, প্রফেসর মুজাফফর আহমেদ), জাতীয় আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি (কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রানো) গেরিলা বাহিনী গড়ে সেক্টর কমান্ডের অধীনে লড়েছেন; পাকিস্তান সেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

১. পশ্চিম বঙ্গের নকশালি ও সিপিআই(এমএল): ইয়াহিয়া খানের “ন্যায়সংগত যুদ্ধ”

১৯৭১ সালের ২৯ জুন তারিখে চারু মজুমদারের লেখা “পাকিস্তান ও কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা” নিবন্ধটি লিবারেশন পত্রিকায় ছাপা হয়। সেই নিবন্ধের সম্পাদকীয় নোটে লেখা আছে, দলের “কয়েকটি ইউনিট” পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহকে নিন্দা করে পত্রিকায় লিখেছে যে —

“সমগ্র সাম্রাজ্যবাদী শিবির ও ভারতীয় বিস্তারবাদীরা পাকিস্তানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, ইয়াহিয়া খানের সরকার সেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত লড়াই করছে, ইয়াহিয়া খানের সরকার পাকিস্তানের জাতীয় বুর্জুয়া গণতন্ত্রের প্রতিনিধি — তাই তাকে সমর্থন করা উচিত।”

কিন্তু এই লাইনের সঙ্গে চারু মজুমদার একমত হননি। তার নিজের বক্তব্যে (২৯ জুন ১৯৭১) বলা হয়, কমিউনিস্ট পার্টির কাজ “ইয়াহিয়া খানকে সমর্থন করা নয়, বিদেশী আক্রমণের বিরুদ্ধে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ঐক্য গড়ার ডাক দেওয়া”। অর্থাৎ পাকিস্তানপন্থী ছিলেন কিন্তু সরাসরি ইয়াহিয়াকে বাহবাহি দেননি — ভারতকেই মূল শত্রু হিসেবে ধরেছিলেন। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই ইয়াহিয়া-সমর্থনী দলিলের রচয়িতা হিসেবে সম্পাদকীয় টীকায় নাম করা হয় আসিম চট্টোপাধ্যায় ও তার সহযোগীদের

সূত্র: চারু মজুমদার, “Pakistan and the Role of the Communist Party”, লিবারেশন, এপ্রিল–জুন ১৯৭১

কলকাতায় সেই বছর কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনা পরিষ্কার মনে রাখার মতো:

  • ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১: সিপিআই(এমএল)-এর একটি চিঠিতে বলা হয়, পূর্ব বঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের জয়ের ফলে “চীনের বিরুদ্ধে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিপদ বেড়ে গেছে”।
  • এপ্রিল ১৯৭১: কলকাতার সিপিআই(এমএল) পোস্টারে পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যুত্থানকে বলা হয় “চীনের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র”
  • ১ মে ১৯৭১: দলের কেন্দ্রীয় মুখপত্র দেশব্রতী-তে মুজিবকে বলা হয় “বাঙালি কুলক ও ব্যবসায়ীদের এজেন্ট”; বলা হয় ভারতের মতো পাকিস্তানকে চীনবিরোধী ব্লকে ধাক্কা দেওয়া যায়নি।
  • জুলাই ১৯৭১: কলকাতায় স্লোগান — “ভারত সরকার! পাকিস্তানের ব্যাপারে হাত দূরে রাখো!”
  • আরও একটি তথ্য: ১৯৭১-এর ২১ এপ্রিলের একটি এপি বার্তায় বলা হয়, কলকাতায় “সন্ত্রাসী অভিযান” চালানো কয়েকজন প্রো-পেকিং নকশালি পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেছেন, ফলে কলকাতায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কমে এসেছে — ভারতীয় কর্তৃপক্ষ “প্রতিরোধ আন্দোলনের বামপন্থী প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগে”।

সূত্র: Nigel Harris, “The Naxalites and the Bangla-Deshi Left”, আন্তর্জাতিক সোশ্যালিজম, ডিসেম্বর ১৯৭১; AP/Indonesian Observer, ২২ এপ্রিল ১৯৭১

২. সিপিআই(এম)-এর ভূমিকা: জনগণের পক্ষে, যুদ্ধের বিরোধে

পশ্চিম বঙ্গের সিপিআই(এম)-এর ১৯৭১ সালের অবস্থান নিজের কেন্দ্রীয় মুখপত্র পিপলস ডেমোক্রেসি-তে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তারিখসহ দেওয়া আছে (এটি দলের নিজস্ব বিবৃতি, তাই স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন):

  • ১৬ মার্চ ১৯৭১: পলিটব্যুরোর বিবৃতি — “পূর্ব বঙ্গের বীর জনগণকে উষ্ণ ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অভিনন্দন”।
  • ২৭ মার্চ ১৯৭১: মহাসচিব পি. সুন্দরয্যা বিবৃতি দেন বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম সমর্থনে।
  • ৪ মে ১৯৭১: সংসদে সিপিআই(এম) সাংসদ জ্যোতির্ময় বসু বাংলাদেশের স্বীকৃতির দাবিতে অনুশোচনা প্রস্তাব আনেন; স্পিকার প্রত্যাখ্যান করলে সমস্ত বিরোধী দল হাঁটা প্রত্যাহার করে
  • ১৬ জুন ১৯৭১: পলিটব্যুরো বলে, ভারত সরকারের যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ “ইয়াহিয়া খানের গোষ্ঠী যে ধরনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ চায়, ঠিক তেমন যুদ্ধে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে রূপান্তরিত করবে”।
  • জুন ১৯৭১: জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সলিডারিটি অ্যান্ড এইড কমিটি গঠন; রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত আগরতলায় বিশাল সভায় অস্থায়ী সরকারের স্বীকৃতির দাবি করেন; ত্রাণ দল ত্রিপুরার শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হয়।
  • ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১: পাকিস্তানের আক্রমণের পর জ্যোতি বসু বলেন — “আমাদের জনগণ ও ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে হবে”; সুন্দরয্যা পাকিস্তানের আক্রমণ প্রতিহত করতে বলেন।
  • ৬ ও ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১: বাংলাদেশের স্বীকৃতি ও বিজয়কে দল স্বাগত জানায়।

তবু “সিপিআই(এম) বাংলাদেশবিরোধী ছিল” — এই অভিযোগের উৎস কোথায়? জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দলটি ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছিল, আর কেন্দ্র সরকারও কতটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল তার প্রমাণ — ২ অক্টোবর ১৯৭১ পর্যন্ত ভারত-সোভিয়েত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় “পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই সমাধান”, আর স্বীকৃতি আসে ৬ ডিসেম্বরে। বিরোধীরা একে বাংলাদেশবিরোধিতা বলেছিলেন; দলটি বলেছিল, ইয়াহিয়া চাওয়া যুদ্ধে ভারতকে টানা যাবে না।

সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি, ২০ মার্চ ২০১৬; Sumanta Banerjee, জনতা উইকলি/মেইনস্ট্রিম, ২৭ নভেম্বর ২০২১

পশ্চিম বঙ্গের জনসাধারণের আচরণ ছিল একদম উল্টো — ৫ এপ্রিল ১৯৭১ কলকাতায় বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতি গঠিত হয়, রাস্তায় রাস্তায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন জমা হয়। এর প্রমাণ: প্রথম আলোর ১৯৭১ ডায়েরি

৩. পূর্ব পাকিস্তানের মাওবাদী: তোহা–আব্দুল হক — সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট “পাকিস্তান-সমর্থন” কেস

পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) — সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তোহা, কৃষি সংগঠক আব্দুল হক, ভিত্তি জেসোর–খুলনা অঞ্চল, চীন-সমর্থিত ও চারু মজুমদারের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭০-এর শেষে ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ভেঙে এই দল গড়া হয়।

তাদের অবস্থান নিয়ে যা যা প্রমাণ পাওয়া গেছে:

  • বাঙালির আত্মনির্ণয়ের অধিকারের বিরোধিতা: তারিখসহ — ১৯৬৮ থেকে সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব মাওবাদী দলের মধ্যে শুধু তোহা–আব্দুল হকের দলই প্রতিরোধে যোগ দিতে অস্বীকার করে; তারা “বাঙালিদের আত্মনির্ণয়ের অধিকারের” বিরোধিতা করে (তারেক আলি, Explosion in a Sub-Continent, পৃ. ৩১৬)।
  • মুজিব = “আমেরিকার এজেন্ট”: ১৯৭১ সালের এপ্রিলে রংপুর শাখার মুদ্রিত লিফটে শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধীকে বলা হয় “চীনের ওপর আক্রমণের ষড়যন্ত্রকারী” এবং বাংলাবন্ধুকে বলা হয় “আমেরিকার এজেন্ট” (জ্যোতি সেন গুপ্ত, History of the Freedom Movement in Bangladesh, পৃ. ২১৮)।
  • যুক্তি: তোহা বলতেন, পাকিস্তানের প্রধান দ্বন্দ্ব “পূর্ব বঙ্গ–পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে নয়, বরং পূর্ব বঙ্গের ভেতরেই বিত্তশালী ও শোষিত শ্রেণির মধ্যে”; তাই প্রথমে আওয়ামী লীগকে “কৃষি ও পুঁজিপতিদের” দল হিসেবে ভাঙতে হবে।
  • পাক সেনার সঙ্গে আলোচনা: লরেন্স লিফসলুটজের Bangladesh: The Unfinished Revolution (পৃ. ২২) থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য —
    (a) আব্দুল হকের গোষ্ঠী পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইঙ্গিত করে যে, সেনাবাহিনী যদি জনগণের ওপর নৃশংসতা বন্ধ করে, তাহলে তারা ভারতীয় আক্রমণ প্রতিহত করতে সাহায্য করবে;
    (b) তোহা নিজে নোয়াখালীতে পাকিস্তানি কর্নেল আসিক হোসেনের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর যৌথ হানার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন — পরে সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়।
  • “দুই মুখী যুদ্ধ”: লিফসলুটজেরই ভাষায় — তোহা-গোষ্ঠী একদিকে পাক সেনার ও অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-অনুগত শক্তির ওপর লড়েছে; কখনও বোঝা গেল না তার মূল শত্রু মুক্তিবাহিনী না পাক সেনা।
  • পাকিস্তানি পুলিশ গোপন প্রতিবেদন থেকে স্বাধীন সমর্থন: ১৯৭১-এর পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চের ফরচুনাইটলি রিপোর্ট বলে, তোহা-আব্দুল হকের দল, ইস্ট বেঙ্গল ওয়ার্কার্স মুভমেন্ট ও সরবাহারা পার্টি পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধী হলেও আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ধরেছিল “ভারতীয় বিস্তারবাদী” বা “বুর্জুয়া আন্দোলন”; তাদের নিজস্ব “মুক্ত অঞ্চল” ছিল এবং নোয়াখালী, পাবনা ও খুলনায় তিন পক্ষের যুদ্ধ চলছিল।

সূত্র: লিফসলুটজ, তারেক আলি, জ্যোতি সেন গুপ্ত ও ওলপার্ট উদ্ধৃতসহ Abdul Matin, “The Role of Maoists in the Murder of Mujib”, BDDiGEST (ইংরেজি); মোহাম্মদ সজ্জাদুর রহমান, “‘East Pakistan’ of 1971 in intelligence documents”, প্রথম আলো (ইংরেজি), ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

একই সঙ্গে কমবেক্ষণেও বলা দরকার — তোহা নিজের দলকে ১৯৭১-এ নোয়াখালীর নদীচরে মুক্ত অঞ্চল গড়ে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি ভাগ করে দেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার কোনো সংঘর্ষ হয় নি — এসব তথ্য রাশেদ খান মেননের লেখায় আছে।

৪. অন্যান্য পূর্ব পাকিস্তান বাম দল: যারা লড়েছেন

  • কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি (সিআর): নেতা কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রানো। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০ ঢাকায় স্বাধীন “পূর্ব বঙ্গের জনতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র”-এর ডাক; ২৫ মার্চের পর শিবপুর–নরসিংদী কেন্দ্রিক সশস্ত্র লড়াই, পিরোজপুর আয়ুধাগার দখল (নেতৃত্বে ফজলু, পরে পাক সেনার হাতে নিহত), ঢাকার “ক্র্যাক প্লাটুন”-এর বেশিরভাগ সদস্য ছিল এই দলের ছাত্রনেতা; কাজী জাফরের দাবি, ঢাকার আশেপাশে প্রায় ১০ হাজার গেরিলা লড়েছেন।
  • বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি/মনি সিং গোষ্ঠী: ১৯৭১-এর ৭ এপ্রিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মনি সিং পালান; তার দাবি, সিপিবি, নাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিলে ১৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধা গড়েছিল; চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ ডুবে; দলের কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য শাহিদুল্লাহ কাইসার-কে পাক সেনা হত্যা করে।
  • নাপ (মুজাফফর)/মনি সিং গোষ্ঠী ও সিপিবি আওয়ামী লীগের গঠিত ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টে (আগস্ট ১৯৭১) ছিল; কিন্তু তোহা, মতিন–আলাউদ্দিন, সিরাজ সিকদার ও জাফর–মেনন গোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া হয়
  • সিরাজ সিকদার–বাশের গোষ্ঠী (বরিশাল ভিত্তিক) ২৫ মার্চের আগেই সামরিক প্রশিক্ষণ ও বোমা তৈরি শুরু করে; ডা. আবদুল মতিন–ডা. আলাউদ্দিন গোষ্ঠী “বাংলাদেশ ব্যাপারে” চট্টগ্রামের শ্রমিক সমর্থন হারায়।
  • এছাড়া ছিল সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক-কৃষক দল (১৯৬৯) ইত্যাদি গোষ্ঠী।

সূত্র: Farooque Chowdhury, ফ্রন্টিয়ার, ১৪–২০ এপ্রিল ২০১৯ (হায়দার আকবর খান রানো সম্পাদিত ৪৮০ পৃষ্ঠার গ্রন্থ মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থার ভূমিকা নিয়ে)

৫. শান্তি কমিটি: বামপন্থী পটভূমির সহযোগীদের নাম

সামরিক শাসন এপ্রিলের শুরু থেকে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি (নাগরিক শান্তি কমিটি) গঠন করে, যাতে থাকে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি), জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগ। পুলিশ প্রতিবেদনে বারবার আসে নূরুল আমিন, খ্বাজা খয়রউদ্দিন ও গোলাম আজম-এর গভর্নর হাউসে সাক্ষাত।

দিন ও স্থানসহ কয়েকটি ঘটনা:

  • ১৩ এপ্রিল ১৯৭১, ঢাকা: জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম থেকে শান্তি কমিটির শোভাযাত্রা — পথিপ্রধান খ্বাজা খয়রউদ্দিন (সংগ্রামী), গোলাম আজম, শফিকুল ইসলাম, পীর মোহসেনউদ্দিন (দুদুমিয়া), সৈয়দ আজিজুল হক (নানা মিয়া), মাহমুদ আলি, আব্দুল জব্বার খাদ্দার, এ.টি. সাদি
  • ১৪ এপ্রিল ১৯৭১, ঢাকা: নাগরিক শান্তি কমিটির সভায় ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটি গঠিত — তাতে সদস্য মাহমুদ আলি।
  • এখানে গুরুত্বের বিষয় মাহমুদ আলি-র পরিচয়: পঞ্চাশ-ষাট দশকে তিনি ছিলেন পূর্ব বঙ্গের একজন অগ্রগামী/বাম রাজনীতিক — পিডিপির মহাসচিব, সেকুলার যৌথ ভোটাধিকারের সমর্থক, ভাষা আন্দোলনের পত্রিকা নববেলাল-এর সম্পাদক; ছয় দফার বিরোধিতায় যাঁর মোচড় বাড়ে — আর ১৯৭১-এ তিনি ছিলেন শান্তি কমিটির সদস্য
  • আগস্ট ১৯৭১: পাকিস্তান সরকার মাহমুদ আলি ও হামিদুল হক চৌধুরী-কে পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী প্রচার অভিযানে পাঠায় (খরচ পাক সরকারের); ৫ অক্টোবর ১৯৭১ জাতিসংঘ মহাসভায় পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের পক্ষে ভারতকে যুদ্ধের দায়ী করেন মাহমুদ আলি।

সূত্র: “The Killers and Collaborators of ’71 — Who Are Where”, ২য় সংস্করণ, পৃ. ৩১–৩২, ৩৪, ৪৭–৪৯; স্ট্যানলি ওলপার্ট, Zulfi Bhutto of Pakistan, পৃ. ২৪৮, ২৫৬; দ্য গার্ডিয়ান, ৬ অক্টোবর ১৯৭১ — সবই উদ্ধৃত BDDiGEST-এ; শান্তি কমিটি গঠনের প্রেক্ষাপট প্রথম আলো (ইংরেজি)-এর বিশ্লেষণে

একটি যাচাই-অপেক্ষিত তথ্য: একটি ডিক্লাসিফায়েড সিআইএ নথিতে “নিক স্ট্যাং — পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির সাধারণ সম্পাদক, সাংবাদিক, ঢাকার দৈনিক সংবাদ-এর নিউজ এডিটর” বলে উল্লেখ আছে — সোভিয়েত-সমর্থিত শান্তি আন্দোলন ও সামরিক শাসনের কমিটির মিল হিসেবে এটি তাৎপর্যপূর্ণ, তবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

৬. ভারতের বামপন্থা, মুজিবনগর সরকার ও আরএডব্লিউ

  • ১ জুন ১৯৭১, কলকাতা: কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রানো অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ-এর সঙ্গে বাংলাদেশের বাম গেরিলাদের মুক্তিযুদ্ধে অন্তর্ভুক্তির দাবি করেন; তাজউদ্দীন প্রত্যাখ্যান করেন — কর্তৃপক্ষ যাচাই করতে হবে, আর তার জন্য ভরসা করতে হবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ওপর।
  • জুনের মাঝামাঝি, আগরতলা: ফিরে যাওয়ার পথে কাজী জাফর আহমেদকে আগরতলায় আরএডব্লিউ আটক করে, শিলংয়ে এক বাগানবাড়িতে সাত দিন জেরা নেয় — প্রশ্ন করেন “আরএডব্লিউ-র পূর্বাঞ্চল প্রধান সুব্রমণ্যম”।
  • ভাসানীর অবস্থা: এপ্রিলের প্রথম দিনে টাঙ্গাইলের বাড়ি পুড়ে গেলে মাওলানা ভাসানী ১৫–১৬ এপ্রিল ১৯৭১ আসামে ঢোকেন; সমগ্র যুদ্ধকাল ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে আটকে রাখে, ৩০ এপ্রিল জলপাইগুড়ির বাম নির্বাসীদের সভায় যেতে দেওয়া হয় না।
  • ভারতীয় সমর্থিত মুজিব বাহিনী বনাম বাম গেরিলা: আরএডব্লিউ-র প্রশিক্ষিত “মুজিব বাহিনীকে” সেপ্টেম্বর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় বামপন্থী প্রতিরোধ ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করার — ফলে ইপিসিপি(এমএল)-এর গেরিলারা একসঙ্গে পাক সেনা, রাজাকার ও “মুক্তিবাহিনী ভাড়াটেদের” বিরুদ্ধে লড়ছিল; জেসোর–খুলনার ঘাঁটি অক্টোবর–নভেম্বরে পড়ে যায়।

সূত্র: Sumanta Banerjee, জনতা উইকলি/মেইনস্ট্রিম, ২৭ নভেম্বর ২০২১

৭. পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের ভূমিকা — যা এখনো প্রমাণসহ পাওয়া যায়নি

অনুসন্ধানের এই পর্যায়ে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের কোনো মুসলিম ব্যক্তি বা সংগঠনের ১৯৭১ সালে পাকিস্তানসমর্থক বিবৃতি, বিক্ষোভ বা সংগঠনের যাচাই-করা প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এটাও সত্যি কথা খোলাখুলি বলা দরকার, কারণ ইতিহাস নিয়ে কথা বলার সময় “প্রমাণ নেই” — এটাও একটি ফলাফল। পশ্চিমবঙ্গের যাচাই-করা তথ্য বরং উল্টো দিকে গেছে: রাস্তায় রাস্তায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন, শরণার্থী ত্রাণ, বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতি। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে নতুন তথ্য পেলে আপডেট করা হবে।

৮. উপসংহার: তিনটি কথা মনে রাখার মতো

  1. বাংলাদেশবিরোধী ছিল বামের একটি নির্দিষ্ট অংশ — কলকাতার সিপিআই(এমএল) (চারু মজুমদার–আসিম চট্টোপাধ্যায়) ও পূর্ব পাকিস্তানের তোহা–আব্দুল হক দল; প্রমাণ নির্দিষ্ট তারিখ, পোস্টার, পত্র, লিফটেট ও পাক সেনার সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত আছে।
  2. সিপিআই(এম) বা কর্মীসমাজ ততটুকু পাকিস্তানপন্থী ছিল না — তারা বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে ছিল, ত্রাণ চালায়, স্বীকৃতির দাবি করে, তবে ভারতের সামরিক যুদ্ধের বিরোধিতা করে — যা বিরোধীরা বাংলাদেশবিরোধিতা হিসেবে প্রচার করেছিল।
  3. বেশিরভাগ পূর্ব পাকিস্তানি বাম দল মুক্তিযুদ্ধে লড়েছে — সিপিবি-নাপ-ছাত্র ইউনিয়নের ১৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধা, সিআর-এর গেরিলা, কাজী জাফর–মেনন–রানোর সমন্বয় কমিটি। “কমিউনিস্ট = পাকিস্তানপন্থী” বললে এদের রক্তের বিনিময় মুছে যাবে।

ইতিহাস সূক্ষ্ম বিষয় — এক বাক্যের দোষমোষ বিচার কোনো দলের পক্ষ-বিরোধে নয়, প্রমাণের পক্ষে হওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র ও ওয়েব লিংক

  1. চারু মজুমদার, “Pakistan and the Role of the Communist Party”, লিবারেশন, এপ্রিল–জুন ১৯৭১
  2. Nigel Harris, “The Naxalites and the Bangla-Deshi Left”, ডিসেম্বর ১৯৭১
  3. AP/Indonesian Observer, “Communists’ to take Over Resistance in Bangla Desh”, ২২ এপ্রিল ১৯৭১
  4. “Dhaka Seminar on Role of Indian Left in The Liberation War of Bangladesh”, পিপলস ডেমোক্রেসি, ২০ মার্চ ২০১৬
  5. Sumanta Banerjee, “Bangladesh Liberation War of 1971 – and a Hidden Episode…”, জনতা উইকলি, ২৭ নভেম্বর ২০২১
  6. Farooque Chowdhury, “Left in Bangladesh Liberation War”, ফ্রন্টিয়ার, ১৪–২০ এপ্রিল ২০১৯
  7. Abdul Matin, “The Role of Maoists in the Murder of Mujib” (লিফসলুটজ, তারেক আলি, ওলপার্ট উদ্ধৃত), BDDiGEST
  8. Mohammad Sajjadur Rahman, “‘East Pakistan’ of 1971 in intelligence documents”, প্রথম আলো (ইংরেজি), ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  9. C. Chintamani, “Indian Communists on Bangladesh: A Review”, China Report 8(3), মে ১৯৭২, পৃ. ১৯–২৪ (পূর্ণ লেখা পে-ওয়াল)
  10. Talukder Maniruzzaman, “Bangladesh: An Unfinished Revolution?”, ১৯৭৫
  11. সিআইএ ইলেকট্রনিক রিডিং রুম — পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির নামেউল্লেখ [যাচাই-অপেক্ষিত]
  12. মার্কসিস্ট ইন্টারনেট আর্কাইভ — কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মনি সিংয়ের কারাগার পালানো, ৭ এপ্রিল ১৯৭১)
  13. Encyclopedia of Anti-Revisionism On-Line — বাংলাদেশ (তোহা ও জিয়াউর রহমান)
  14. বদরুদ্দিন উমর, দ্য ইমার্জেন্স অফ বাংলাদেশ (সম্পূর্ণ পিডিএফ)
  15. উইকিপিডিয়া — মোহাম্মদ তোহা
  16. উইকিপিডিয়া — কাজী জাফর আহমেদ
  17. প্রথম আলো ১৯৭১ ডায়েরি — পশ্চিমবঙ্গের জনতার মুক্তিযুদ্ধে একাত্মতা

পাদটীকা: উপরের কয়েকটি সূত্র দলীয় নিজস্ব বিবৃতি (যেমন পিপলস ডেমোক্রেসি) বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রবন্ধ (যেমন BDDiGEST) — তাই সেগুলোর মূল বই ও নথিগুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যে-সব দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি, সেগুলো “[যাচাই-অপেক্ষিত]” চিহ্নিত।

১৯৭১: বামপন্থীদের ভূমিকা — কে বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, কে বিরোধী

১৯৭১: বামপন্থীদের ভূমিকা — কে বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, কে বিরোধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট ও বামপন্থী শক্তিগুলোর অবস্থান নিয়...